ইরান পরিস্থিতির আদ্যোপান্ত: যুদ্ধ কী এখন অনিবার্য?

ইরান থেকে সবশেষ যা জানা গেল, তা হচ্ছে— দেশটিতে বিক্ষোভ ও দাঙ্গা পরিস্থিতি কমে গেছে। ১২ জানুয়ারি সারা দেশে সরকারপন্থি বিক্ষোভ-মিছিল হবে। ইরানে কিছু লোক গত কয়েকদিন ধরে যে দাঙ্গা ও নাশকতামূলক তৎপরতা চালাচ্ছিল তার বিপরীতে মাঠে নামবে সরকার সমর্থক ও সাধারণ জনগণ। এর কারণ হলো, অর্থনৈতিক সংকটের কথা বলে বিক্ষোভ শুরু করা হলেও দিন দিন দেখা যাচ্ছে— ইসরাইল ও আমেরিকার সম্পৃক্ততা বেড়েছে।

চলমান সহিংসতার সময় কাউকে কাউকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ছবি ও প্ল্যাকার্ড বহন করতে দেখা গেছে। এ ছাড়া, ধরা পড়া নাশকতাকারীদের অনেকেই ইসরায়েলের এজেন্ট হিসেবে কাজ করার কথা স্বীকার করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বেশ কয়েকবার ঘোষণা দিয়েছেন, তার সরকার ইরানি জনগণকে উদ্ধার করতে আসবে। একই ধরনের কথা ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন।তাদের এসব কথাবার্তা ইরানি জনগণকে সতর্ক হতে সহযোগিতা করেছে। এ ছাড়া, সিরিয়ায় আসাদ সরকারের পতনের পর সেখানে কী অবস্থা করেছে ইসরায়েল, তা ইরানি জনগণের কাছে একদম পরিষ্কার। ফলে তাদের একটা অংশ অর্থনৈতিক সংকট কাটাতে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চাইলেও ইসরায়েল ও আমেরিকার হস্তক্ষেপ চায় না।

আবার হামলার কথা ভাবছেন ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে হামলার নির্দেশ দেবেন কি না, বিষয়টি বিবেচনা করছেন।

নিউইয়র্ক টাইমস এই খবর দিয়েছে। ইরানে চলমান বিক্ষোভ ও দাঙ্গার প্রেক্ষাপটে এই হামলার কথা আলোচিত হচ্ছে। ইরানি মুদ্রার মান ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ার কারণে চলমান দাঙ্গা শুরু হয়। মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে শনিবার নিউইয়র্ক টাইমস এই খবর প্রকাশ করেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ট্রাম্পকে কয়েকটি সম্ভাব্য অপশনের বিষয়ে ব্রিফ করা হয়েছে।এর মধ্যে তেহরানের বেসামরিক কিছু স্থাপনায় হামলা চালানো হবে। তবে এখনো তিনি চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেননি। অতীতে ইরানকে নিয়ে ট্রাম্প একাধিকবার কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন এবং শনিবার প্রকাশ্যে বিক্ষোভকারীদের প্রতি সমর্থনও জানিয়েছেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শনিবার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘সহায়তা দিতে প্রস্তুত’। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘ইরান এখন স্বাধীনতার দিকে তাকিয়ে আছে, হয়তো আগের যেকোনো সময়ের চেয়েও বেশি। যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা দিতে প্রস্তুত!’ তবে তিনি কী ধরনের সহায়তার কথা বলছেন, সে বিষয়ে কোনো বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি।

এদিকে, ইরানের ইসফাহান প্রদেশের গভর্নর নিশ্চিত করেছেন, সাম্প্রতিক বিদেশি সমর্থিত দাঙ্গায় সেখানে নিরাপত্তা বাহিনীর অন্তত ৩০ জন সদস্য নিহত হয়েছেন। রোববার কথা বলতে গিয়ে গভর্নর আলী আহমাদি জানান, নিহতদের জন্য সোমবার জানাজা ও দাফনের আয়োজন করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, এই সশস্ত্র দাঙ্গায় নিহত বেসামরিক মানুষের মধ্যে মাত্র দুই মাস বয়সী এক শিশুও রয়েছে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, দাঙ্গার কারণে ইসফাহানে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে ১০টি মসজিদে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। পাশের ফার্স প্রদেশে দাঙ্গার সময় কমপক্ষে ১২ জন নিরাপত্তা সদস্য নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন প্রাদেশিক শহীদ ফাউন্ডেশনের পরিচালক ইব্রাহিম বায়ানি।

এ ছাড়া, পুলিশের বিশেষ ইউনিটের প্রধান মাসউদ মোদাক্ক জানিয়েছেন, তার বাহিনীর ৮ জন সদস্যও দাঙ্গায় প্রাণ হারিয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত দেশজুড়ে এসব সহিংসতায় মোট কতজন নিরাপত্তা সদস্য বা বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন, তার পূর্ণ হিসাব প্রকাশ করা হয়নি। দেশের বিভিন্ন এলাকায় চিকিৎসা কেন্দ্র ও ত্রাণ সহায়তা কেন্দ্রে হামলার ঘটনাও ঘটেছে। উত্তরাঞ্চলীয় গিলান প্রদেশে এক হামলায় রেড ক্রিসেন্টের এক স্বেচ্ছাসেবক নিহত হয়েছেন। সারা দেশে আরো ৫ জন রেড ক্রিসেন্ট কর্মী আহত হয়েছেন।

ইরানি কর্মকর্তারা আবারো বলেছেন, অর্থনৈতিক সমস্যার কারণে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ বৈধ এবং সরকার তা গুরুত্ব দিয়ে দেখবে। কিন্তু হিংসা, ভাঙচুর ও নাশকতা কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না।

কর্তৃপক্ষের দাবি, দাঙ্গাকারীরা জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও রিয়ালের বড় দরপতনের বিষয়কে কাজে লাগিয়েছে। এসব সমস্যার জন্য তারা ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও তেল রপ্তানির ওপর মার্কিন একতরফা নিষেধাজ্ঞাকে দায়ী করছে।

নিরাপত্তা ও বিচার বিভাগ জানিয়েছে, তারা একাধিক সশস্ত্র সন্ত্রাসী চক্র ভেঙে দিয়েছে এবং বিদেশি যোগাযোগ রয়েছে, এমন অনেককে গ্রেপ্তার করেছে।

ইরানি কর্মকর্তাদের দাবি, আমেরিকা ও ইসরায়েলের কিছু ব্যক্তি প্রকাশ্যেই সহিংসতা উসকে দিয়েছেন। এর মধ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্যও রয়েছে, যেখানে তিনি তথাকথিত ‘শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের’ ক্ষতি হলে ইরানে হামলার হুমকি দেন। সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও-ও ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা ও বিচ্ছিন্নতাবাদী ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত দিয়েছেন।

ইসলামি বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়েদ আলি খামেনি শুক্রবার বলেছেন, ভাঙচুরকারীদের কাছে ইসলামি প্রজাতন্ত্র মাথা নত করবে না এবং বিদেশি ভাড়াটে হিসেবে কাজ করা কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

কেন এই সংকট
প্রশ্ন হচ্ছে ইরানে কেন এই সংকট তৈরি হলো? তার আগে একটু বলে রাখি, ইরানের সংকট যতটা তার বিপরীতে অপপ্রচারও কিন্তু কম নয়। এর একটা ছোট্ট প্রমাণ হচ্ছে, ইরানে বর্তমানে এক কেজি গরুর গোস্তের দাম এক কোটি রিয়াল। এর মানে হচ্ছে বাংলাদেশি টাকায় ৮৯২ টাকা। কিন্তু আমাদের দেশের অনেক গণমাধ্যম এই হিসাবটা ঠিকমতো করতে পারেনি বরং তারা হিসাব প্রকাশ করেছে এক কেজি গরুর গোস্তের দাম ২৯ হাজার টাকা। এই ধরনের নানামুখী অপপ্রচারের শিকার ইরান, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। যে আমেরিকার সাথে এত দ্বন্দ্ব বরং সেই আমেরিকায় এক কেজি গরুর গোস্তের দাম প্রায় দুই হাজার টাকা।

যাই হোক ফিরে আসি মূল প্রশ্নে, কেন এই সংকট তৈরি হলো? এ সংকটের একেবারে মূলে রয়েছে ইরানের ইসলামি বিপ্লব সফল হওয়া এবং আমেরিকার শত্রুতা ও নিষেধাজ্ঞা আরোপ। ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লব সফল হওয়ার পর মূলত ইরানের ওপর থেকে মার্কিন আধিপত্য একেবারে শেষ হয়ে যায়। অথচ ইরান তখন ছিল মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। সেখানে আমেরিকার যেমন সব গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তির উপস্থিতি ছিল তেমনি ছিল তেল খনিগুলোর ওপর আধিপত্য ও ব্যাপক বিনিয়োগ। বিপ্লবের মাধ্যমে ইরানের জনগণ সরাসরি আমেরিকাকে ‘না’ বলে দেয়। যার কারণে ইরানে আমেরিকার আর কোনো অবস্থান থাকে না। এ ছাড়া বিপ্লব পরবর্তী ইরান যদি স্বাভাবিকভাবে শক্ত পায়ে এগিয়ে যায় তাহলে আমেরিকাকে পদে পদে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে। সর্বোপরি মধ্যপ্রাচ্যে এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে আমেরিকার আধিপত্য খর্ব হবে। বিশ্বের বহু জনপদে মার্কিন আধিপত্যকে অস্বীকার করা হবে। এইসব চিন্তা থেকে আমেরিকা যেমন বিপ্লব সফল হওয়ার পর থেকেই ইরানের ভেতরে নানামুখী চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের চেষ্টা করে, তেমনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষ করে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে আমেরিকার আধিপত্য থাকার কারণে ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এই নিষেধাজ্ঞা শুধু আমেরিকাই অনুসরণ করেনি বরং বিশ্বের বহু দেশ তা অনুসরণ করেছে। ফলে ইরানকে স্বাভাবিক অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়তে হয়েছে। সেই চাপ দীর্ঘ চার দশকের বেশি সময় ধরে মোকাবিলা করে আসছে ইরান। এই অর্থনৈতিকসহ অন্যান্য চাপ প্রয়োগের মধ্য দিয়ে ইরানকে কাবু করতে না পেরে গত বছরে প্রথম দফায় ইসরায়েলকে দিয়ে এবং শেষ দফায় ইসরায়েলের সাথে আমেরিকা যুক্ত হয়ে ইরানের ওপর সামরিক হামলা চালায়। এই হামলার মাধ্যমেও খুব একটা যুৎ করতে না পেরে আবার ইরানের ভেতর থেকে সরকারকে দুর্বল করে দেওয়ার জন্য এই বিক্ষোভ এবং নাশকতার ব্যবস্থা করেছে ওয়াশিংটন। এখানে ওয়াশিংটনের সাথে ইসরায়েলের গোয়েন্দা মেশিন খুবই সক্রিয় বলে ইরানের পক্ষ থেকে এবং বিভিন্ন সূত্র থেকে জানানো হচ্ছে।

আমেরিকার দায়
চলমান এই সংকট অর্থাৎ ইরানের ভেতরে যে মুদ্রাস্ফীতি এবং দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির ঘটনা তাতে কার কত দায় রয়েছে, সে আলোচনাটা এখানে খুবই প্রাসঙ্গিক। ইরানের ভেতরে যে মুদ্রাস্ফীতি ও দ্রব্যমূল্য বেড়েছে তা নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রাথমিকভাবে ইরান সরকারের দায়িত্ব। এই কর্তব্য পালনের চেষ্টা ইরান সরকার যে করেনি তা নয়। বরং ইরানের ধর্মীয় মাজহাবগত ও কঠিন জাতীয়তাবাদী চিন্তা থেকে দেশটির জনগণের জীবনমানকে উন্নত করার চেষ্টা অবশ্যই ইরানের সরকারের ভেতরে থাকার কথা। তাদের যে জাতীয়তাবাদী চেতনা তাতে আশপাশের কোনো দেশের চেয়ে ইরানি জনগণ খারাপ থাকবে কিংবা না খেয়ে থাকবে, এমনটা ইরান সরকারের ভাবার কথা নয়। সর্বোপরি তারা বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা সরকার। ফলে দেশের মানুষের জীবনমানের উন্নতি ঘটানোর অঙ্গীকার তাদের ছিল এবং সেই অঙ্গীকার পালন না করার কোনো কথা নয়। কিন্তু গোল বেঁধেছে ভিন্ন জায়গায়। সেটি হচ্ছে, আমেরিকা এবং তার পশ্চিমা মিত্ররা। আমেরিকা এবং তার পশ্চিমা মিত্ররা যদি জোর জবরদস্তি করে ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ না করতো এবং ইরান সরকারকে ভেতর থেকে ধসিয়ে দেওয়ার চেষ্টা-চক্রান্ত না করতো তাহলে ইরানে কোনমতেই এই আর্থিক সংকট বা মুদ্রাস্ফীতির ঘটনা ঘটতো না। তাহলে এ কথা পরিষ্কার হয় যে, ইরানে মুদ্রাস্ফীতি সৃষ্টি করে এবং জনজীবনে সংকট তৈরি করে আবার সেই জনগণকে ইরান সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের উসকানি দেওয়া হচ্ছে। শুধু তাই নয়, বিক্ষোভে লোকজনকে টেনে আনার জন্য তাদের আর্থিক ও রাজনৈতিক সমর্থন দেওয়া হচ্ছে। বিষয়টা এমন যে, ‘সর্প হয়ে কামড় দিয়ে ওঝা হয়ে ঝাড়া’র মতো ব্যাপার। আমেরিকা একদিক দিয়ে ইরানের সরকারের ওপরে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে দেশের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে আবার জনগণকে উসকানি দিচ্ছে সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিতে, যাতে অর্থনীতি ভালো করা যায়। বাস্তবতা হচ্ছে, আমেরিকা ইরানি জনগণের ভালো চাইলে তারা ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করত না। তাদের এই নিষেধাজ্ঞার কারণেই তো দেশের অর্থনীতিতে ও জনজীবনে সংকট সৃষ্টি হয়েছে। এতে জনগণই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাহলে আল্টিমেটলি একথা বলার সুযোগ আছে যে, আমেরিকা মূলত ইরানের সরকার পরিবর্তন করার জন্য বিভিন্নভাবে প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। তারই একটা অংশ হচ্ছে, এই অর্থনৈতিক দুর্দশা সৃষ্টি এবং মূল্যস্ফীতি ঘটানো।

হুমকি মোকাবিলায় ইরান কী করবে?

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েল মাঝে মধ্যেই হুমকি দিচ্ছে যে, তারা ইরানের ওপরে হামলা চালাতে পারে। আধুনিক বিশ্বে এই ধরনের হুমকি কোনমতেই গ্রহণযোগ্য নয়, বরং খুবই অগণতান্ত্রিক। এরপরেও যদি আমেরিকা ও তার মিত্র ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে হামলার চিন্তা করে তাহলে ইরান কোনমতেই ছেড়ে কথা বলবে না। ইরান তার সর্বশক্তি নিয়োগ করবে আমেরিকাকে মোকাবিলার জন্য।

এখানে আরেকটি কথা মনে রাখার মতো। সেটি হচ্ছে ইরান কিন্তু চীন ও রাশিয়ার বলয়ের একটি দেশ, যে বলয় বিশ্ব ব্যবস্থায় আমেরিকার আধিপত্য নস্যাৎ করতে চায়। এই বলয় থেকে যদি ইরান ছিটকে পড়ে বা ইরান ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাহলে মূলত এই ত্রিপক্ষীয় বলয় ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এজন্য ইরানকে জীবন বাজি রেখে লড়াই করতে হবে। পাশাপাশি রাশিয়া ও চীন ইরানকে সর্বাত্মক সহযোগিতা দেবে বলে ধরে নেয়া যায়। সমীকরণটা যদি এভাবে চলে তাহলে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঝুঁকি রয়েছে সামনে। বিষয়টি আমেরিকাকেও মাথায় রাখতে হবে। তখন আমেরিকাকে হয়তো আম-ছালা দুটোই হারাতে হতে পারে। তাই বলে যে, ইরানের ওপরে আমেরিকা বা ইসরায়েল হামলা চালাবে না কিংবা এই তিনটি শক্তির মধ্যে সংঘাত হবে না তার নিশ্চয়তা দেওয়া যাবে না। বরং যেকোন মুহূর্তে সংঘাত শুরু হতে পারে, তেমন একটা জোরালো আশঙ্কা রয়েছে।

বিষয়টি ইরানেরও মাথায় আছে। তারাও বিষয়টি সেভাবেই সামনে রেখেছে। ইরানের ওপরে ইসরায়েল একা হামলা চালাক অথবা আমেরিকাকে সাথে নিয়ে সংঘাত শুরু করুক— পরিস্থিতি যাই হোক ইরান তা নিজের শক্তি সামর্থ্য ও মেধা দিয়ে মোকাবিলা করবে। এ ছাড়া ইরানের সামনে বিকল্প কোনো পথ নেই।

সম্ভাব্য সংঘাতের পরিণতি কী?
ইরানের সাথে আমেরিকা ও ইসরায়েলের সামরিক সংঘাত অনিবার্য, সে কথা নতুন করে বলার কিছু নেই। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি এবং সবসময় বলি, ইরানের ইসলামি বিপ্লব নস্যাৎ করার জন্য আমেরিকা ও ইসরায়েল চূড়ান্ত কামড় দেবে, এটা অবশ্যম্ভাবী। উল্টো দিক থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য ইরানকে অবশ্যই তা মোকাবিলা করতে হবে। ফলে এই তিন শক্তির মধ্যে সামরিক সংঘাত অনিবার্য। এই তিন শক্তির মধ্যে কূটনৈতিক উপায়ে চলমান সংকট বা সম্পর্কের পারস্পারিক টানাপড়েন দূর করা যাবে না। ফলে আবারো বলতে হচ্ছে, সংঘাত অনিবার্য। এখন সম্ভাব্য সেই সংঘাতে যদি ইরান হেরে যায়, ইরানের ইসলামি সরকারের পতন ঘটে তাহলে একটি সভ্যতার পতন ঘটবে। এর মধ্য দিয়ে ইরানের ভেতরে সামগ্রিক পরিবর্তন ঘটে যাবে। ইরানের ভূখণ্ড হবে আমেরিকা ও ইসরায়েলের দৌরাত্ম্যের ঘোড়া দাবড়ানোর খোলা মাঠ। অর্থাৎ ইরানের সামরিক অবকাঠামো বলতে আর কিছু থাকবে না। পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক কাঠামোতে পরিবর্তন আসবে। বহুদিনের লালিত স্বপ্ন ‘নিউ মিডল ইস্ট প্ল্যান’ বাস্তবায়ন হবে। তাতে ভূমধ্যসাগরের উপকূল থেকে চীনের পাদদেশ পর্যন্ত বিস্তীর্ণ জনপদ চলে যাবে আমেরিকা ও ইসরায়েলের কব্জায়। মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার লুটপাটতন্ত্রের বিরুদ্ধে কথা বলার মতো আর কোনো শক্তি থাকবে না। মধ্যপ্রাচ্যে যে সমস্ত ইসরায়েল ও মার্কিন বিরোধী শক্তি গড়ে উঠেছে সেগুলোর পতন হবে। মধ্যপ্রাচ্যের তেল সম্পদ ও খনিজ সম্পদের ওপর মার্কিন সরকারের একাধিপত্য এতটাই জোরালো হবে যে, তখন চীনের অর্থনীতিতে তা মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। কারণ এখনো চীন মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। এ ছাড়া ইরান, রাশিয়া ও চীন মিলে যে মার্কিন-বিরোধী বলয় গড়ে তুলেছে এবং তারা যে বহুপক্ষীয় বিশ্ব ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, তা আর বাস্তবায়ন হবে না। তখন চীন ও রাশিয়ার মতো শক্তিও ধীরে ধীরে ক্ষয়িষ্ণু শক্তিতে পরিণত হবে। মার্কিন একাধিপত্যের কারণে বিশ্ব আদিম অবস্থায় ফিরে যেতে পারে, যেখানে আইনের শাসন বলতে কোনো কিছু থাকবে না। দুর্বলের অধিকার বলে কোনো কিছু অবশিষ্ট রইবে না। এর সামান্য কিছু নজির আমরা দেখতে পাচ্ছি ভেনিজুয়েলায়। এ ছাড়া গ্রিনল্যান্ডে সামরিক অভিযান চালিয়ে এই দ্বীপটি দখলের যে হুমকি দিচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, তার ভেতরেও সম্ভাব্য মার্কিন একাধিপত্যবাদের ফলাফলের একটা ইঙ্গিত আছে।

সিরাজুল ইসলাম: সাংবাদিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *